রাকসু নির্বাচনে মনোনয়নপত্র উত্তোলনের শেষ দিন : দিনভর ছাত্রদল, শিবির ও ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা

রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) মনোনয়নপত্র উত্তোলনের শেষ দিন ছিল। তবে সকাল থেকেই পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি মোতাবেক রাকসু কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর নেতৃত্বে ভাঙচুর চালায় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল রোববার সকাল সোয়া ১০টার দিকে সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মারকে আটকে রেখে এ ভাঙচুর ও তালা দেয় ছাত্রদল।
এরপর থেকেই ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় উত্তেজনা। ছাত্রদলকে প্রতিহত করতে ও রাকসুর কার্যক্রম চালু করতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিবির একজোট হয়ে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা জানান, গত শনিবার সকাল ৯টা থেকে কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে ছাত্রদল। অন্যদিকে সকাল ১০টা থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হয়।
সোয়া ১০টার দিকে ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর নেতৃত্বে কিছু নেতাকর্মী কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে মনোনয়ন বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে বারান্দায় থাকা একটি প্লাস্টিকের চেয়ার ভেঙে ফেলেন এবং একটি টেবিল উল্টে দেন। এরপর ফটকে তালা মেরে দেন তারা। এসময় তারা ‘জিয়ার সৈনিক, এক হও লড়াই করো’, ‘প্রথম বর্ষের ভোটাধিকার, ছাত্রদলের অঙ্গীকার’, ‘আমার ভাইকে বাদ দিয়ে, রাকসুতে যাব না’, ‘রাকসু আমার অধিকার, তুমি কে বাদ দেওয়ার’, ‘ছাত্রদলের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘প্রথম বর্ষের ভোটাধিকার, দিতে হবে দিতে হবে’, ‘রাকসু ফি দিয়েছি, ভোটার হতে চেয়েছি’, ‘ডাকসু-রাকসু নির্বাচনে, প্রথম বর্ষ ভোট দেবে’, ‘প্রথম বর্ষের ভোটাধিকার, ফকির কে কেড়ে নেওয়ার’, ‘প্রথম বর্ষের ভোটাধিকার, নকিব কে কেড়ে নেওয়ার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ভাঙচুরের বিষয়ে রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আমরা কোনো ভাঙচুর করিনি। টেবিলটা শুধু সরিয়ে দেওয়া হয়। দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা সেখানে অবস্থান করব। এসময় ছাত্রদলের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির ও রাবি শাখার সদস্য অধ্যাপক এ নাঈম ফারুকি, সহপ্রচার সম্পাদক অধ্যাপক আতাউর রহমান, রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বাবু, সিনিয়র সহসভাপতি খালেকুজ্জামান মিজান ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলিমসহ অন্য নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
প্রথম বর্ষের ভোটাধিকার বিষয়ে রাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ. নজরুল ইসলাম বলেন, যখন রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন বর্তমানে প্রথম বর্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না। এখন আর তাদের ভোটার করার সুযোগ নেই। তারা আগামী নির্বাচনে ভোটাধিকার পাবেন।
তবে পরে রাবি শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় ছাত্রদল। প্রায় তিন ঘণ্টা পর ছাত্রদলের লাগানো তালা ভেঙে রাকসু কোষাধ্যক্ষের কার্যালয় খুলে দেয় শিক্ষার্থীরা। রোববার দুপুর সোয়া ১টার দিকে তালা ভাঙার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের কর্মসূচি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন। উত্তেজনার মধ্যেই দুপুর ২টা থেকে রাকসু নির্বাচনের শেষ দিনের স্থগিত থাকা মনোনয়নপত্র বিতরণ কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
তফসিল ঘোষণার পর রোববার মনোনয়ন ফরম উত্তোলনের শেষ দিন ছিল। বেলা ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী বিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাবির সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী মনোনয়ন ফরম নিতে কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে গেলে তারা দেখেন, ফটকে তালা ঝুলছে। আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নিয়ে ছিলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তখন সালাউদ্দিন আম্মার ও তার সঙ্গীরা ফটকের সামনে অবস্থান নিলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরেন।
উভয় পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়ে ধস্তাধস্তিতে রূপ নেয়। এ নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় বাকবিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়ার জন্য ১০ মিনিট সময় বেঁধে দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালা না খুলে দিলে শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে এগিয়ে গিয়ে কার্যালয়ের দরজায় ছাত্রদলের লাগানো তালাটি ভেঙে ফেলে।
এসময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে। শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে রাকসু কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে প্রবেশের পর ছাত্রদল বিরোধী নানা স্লোগান দিতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরই ফের রাকসু কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে মাটিতে বসে অবস্থান নেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থানে হয়ে একে অপরকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় একে অপরদের জুতা-পানির বোতল ছোড়াছুড়ি করতে দেখা যায়।
আরও পড়ুনঘটনার এক পর্যায়ে মিছিল নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে আসে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। তাদের মিছিলের কারণে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ফের পিছু হটেন। একপর্যায়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগানের সময় ছাত্রদলের মাইক খুলে ভাঙচুর করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এ ঘটনা নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই রাকসু কার্যালয়ের সামনে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ও ছাত্র উপদেষ্টা আমিরুল ইসলাম কনক। পরবর্তীতে তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কথা বলেন। প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর উত্তেজনার মধ্যেই দুপুর ২ টার দিকে ফের শুরু হয় মনোনয়ন বিতরণের কার্যক্রম। শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী বিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ, অন্য শিক্ষার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বলে রাকসু’র প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সেতাউর রহমান নিশ্চিত করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, সকাল থেকেই নির্বাচন কমিশনের সাথে আমার কয়েক দফা মিটিং হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, একটা সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে এটা মানা সম্ভব নয়। সব সংগঠন এবং সব পক্ষ যদি বলে; তখন সেটা বিবেচনা করা যাবে। এছাড়াও যখন তফসিল হয়েছে তখন প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়নি, ফলে তাদের ছাত্রত্ব ছিল না।
নির্বাচন কমিশনও আলাদাভাবে আলোচনা করে জানিয়েছে, এই তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন করতে চাইলে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়। পরে বিকেলে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। ছাত্রদল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানালেও শিবির জানায়, অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নির্বাচন পূর্বনির্ধারিত তারিখেই অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।
এদিকে সন্ধ্যায় রাকসু নির্বাচনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের দাবিকে ঘিরে আয়োজিত জরুরি মতবিনিময় সভা থেকে ওয়াকআউট করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’। রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে রাকসু প্রার্থী ও সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোকে নিয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ছাত্রদল ও ছাত্রজোট হঠাৎ করেই বৈঠক বর্জন করে বের হয়ে যায়। সভায় নির্বাচন কমিশন জানায়, পূর্বনির্ধারিত তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বরেই ভোট গ্রহণ হবে। তবে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ সোমবার জানানো হবে।
ওয়াকআউটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছাত্রদল অভিযোগ করে, সভায় আলোচনার অনুকূল পরিবেশ ছিল না। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট জানায়, ৫ আগস্টের মশাল মিছিলে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আলোচনায় অংশগ্রহণ মেনে নেওয়া যায় না, তাই তারা সভা বর্জন করেছে। শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আমরা আলোচনায় এসে দেখি, তারা বাংলাদেশপন্থি কমিশনার নন, পাকিস্তানপন্থি কমিশনার। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪-এর জুলাই-আগস্টের চেতনা এই প্রশাসন ধারণ করে না।
তাই সভা বর্জন করে বের হয়ে এসেছি।” গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সংগঠক ও শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ৫ অগাস্ট গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মশাল মিছিলে ছাত্রশিবির সমর্থিত একটি গোষ্ঠী হামলা চালায়। হামলায় চিহ্নিত ব্যক্তিরা আজ এখানে বক্তব্য দিচ্ছে এবং প্রশাসন তা মেনে নিচ্ছে। আমরা এমন সন্ত্রাসীদের সঙ্গে একই হাউজ শেয়ার করতে পারি না, তাই সভা বর্জন করেছি।
রাকসু নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ভোটের তারিখ ঠিক থাকবে। তবে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কমিশন আগামীকাল সভায় সিদ্ধান্ত নেবে। আপাতত মনোনয়নপত্র বিতরণ স্থগিত রাখা হয়েছে।
মন্তব্য করুন